প্রশ্ন
👤 প্রশ্নকারী: নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক — ঢাকা, বাংলাদেশ
নামাজে নিয়ত মুখে উচ্চারণ করে পড়ার বিধান কী?
👤 প্রশ্নকারী: নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক — ঢাকা, বাংলাদেশ
নামাজে নিয়ত মুখে উচ্চারণ করে পড়ার বিধান কী?
নিয়ত উচ্চারণ করে পড়া
সাম্প্রতিক সময়ে কিছু তথাকথিত সালাফি যেসব বিষয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে, তার মধ্যে একটি হচ্ছে নিয়তের উচ্চারণ। অথচ প্রিয় নবীজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তা উচ্চারণ করেছেন, এবং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের ইমাম, ইমাম শাফেয়ী (রহিমাহুল্লাহ) তা উচ্চারণ করেছেন। প্রাচীনকাল থেকেই উলামা ও ইমামগণ এ বিষয়ে অনুমতি দিয়ে আসছেন।
নবীজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তা উচ্চারণ করেছেন
عَنْ عَائِشَةَ أُمِّ الْمُؤْمِنِينَ، - رضى الله عنها - قَالَتْ قَالَ لِي رَسُولُ اللَّهِ ﷺذَاتَ يَوْمٍ " يَا عَائِشَةُ هَلْ عِنْدَكُمْ شَىْءٌ " . قَالَتْ فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا عِنْدَنَا شَىْءٌ . قَالَ " فَإِنِّي صَائِمٌ
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: একদিন আল্লাহর রাসূল ﷺ আমাকে বললেন, 'হে আয়েশা! তোমাদের কাছে কিছু আছে কি?' আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের কাছে কিছুই নেই।' তিনি বললেন, 'তাহলে আমি রোযা রাখছি।
মুসলিম, কিতাবুস সিয়াম, হাদিস ১১৫৪
عَنْ أَنَسٍ رضى الله عنه قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺأَهَلَّ بِهِمَا جَمِيعًا " لَبَّيْكَ عُمْرَةً وَحَجًّا لَبَّيْكَ عُمْرَةً وَحَجًّا
আনাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে শুনেছি, তিনি উমরা ও হজ একসাথে আদায়ের ইহরাম বাঁধার সময় বলছিলেন:
"লাব্বাইকা উমরাতান ওয়া হাজ্জান, লাব্বাইকা উমরাতান ওয়া হাজ্জান"
(অর্থ: আমি হাযির, হে আল্লাহ! উমরা ও হজের জন্য; আমি হাযির, উমরা ও হজের জন্য)। মুসলিম, কিতাবুল হাজ্জ, হাদিস ১২৫১
وَ قَالَ أَنَسٌ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَقُولُ " لَبَّيْكَ بِعُمْرَةٍ وَحَجٍّ
আনাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি:
"লাব্বাইকা বি‘উমরাতিন ওয়া হাজ্জিন" (অর্থ: আমি হাযির, হে আল্লাহ! একটি উমরা ও একটি হজের জন্য)।
ইমাম শাফী নিয়ত উচ্চারণ করেছেনঃ
فَقَدْ رَوَى ابْنُ المُقْرِئِ فِيْ مُعْجَمِه: أَخْبَرَنَا ابْنُ خُزَيْمَةَ، ثَنَا الرَّبِيْعُ قَالَ: " كَانَ الشَّافِعِيُّ إِذَا أَرَادَ أَنْ يَدْخُلَ فِي الصَّلَاةَ قَالَ: بِسْمِ اللَّهِ، مُوَجِّهًا لَبَيْتِ اللَّهِ مُؤْدِيًا لِفَرْضِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ اللَّهُ أَكْبَرُ
ইবনুল মুকরি তাঁর "মু‘জামে" বর্ণনা করেছেন: আমাদেরকে খবর দিয়েছেন ইবনু খুযাইমা, তিনি বলেন: আমাদেরকে রাবীই বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন:
"শাফেয়ী (রহিমাহুল্লাহ) যখন সালাতে প্রবেশ করতে চাইতেন, তখন তিনি বলতেন:
بِسْمِ اللَّهِ، مُوَجِّهًا لَبَيْتِ اللَّهِ مُؤْدِيًا لِفَرْضِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ اللَّهُ أَكْبَرُ
'বিসমিল্লাহ, কিবলার দিকে মুখ করে আল্লাহর ফরয আদায়ের নিয়তে, আল্লাহু আকবার।'
وَذَكَرَ السُّبْكِيُّ فِيْ الطَّبَقَاتِ: قَالَ ابْنُ خُزَيْمَة ، حَدَّثَنَا الرَّبِيْعُ قَالَ: كَانَ الشَّافِعِىُّ إِذَا أَرَادَ أَنْ يَّدْخُلَ فِيْ الصَّلَاةِ قَالَ بِسْمِ اللهِ مُتَوَجِّهًا لِبَيْتِ اللهِ مُؤَدِّيًا لِعِبَادَةِ اللهِ
সুবকী তাঁর "ত্ববাকাত" গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন: ইবনু খুযাইমা বলেন, আমাদের কাছে হাদীস বর্ণনা করেছেন রাবীই; তিনি বলেন: "শাফেয়ী (রহিমাহুল্লাহ) যখন সালাতে প্রবেশ করতে চাইতেন, তখন তিনি বলতেন:
بِسْمِ اللهِ مُتَوَجِّهًا لِبَيْتِ اللهِ مُؤَدِّيًا لِعِبَادَةِ اللهِ
‘বিসমিল্লাহ, কিবলার দিকে মুখ করে, আল্লাহর ইবাদত আদায়ের উদ্দেশ্যে।
- সুবকী, তাবাক্বাতুশ শাফিয়িয়্যাহ, ২/১৩৯
আল-মাউসূআতুল ফিকহিয়্যাহ কিতাবে এসেছেঃ
নিয়তের উচ্চারণ:
জমহুর (অধিকাংশ) ফকিহদের মতে, নিয়তের স্থান হলো অন্তর। এই মতের উপর ভিত্তি করে দুটি বিষয় নির্ধারিত হয়:
১. শুধুমাত্র মুখে উচ্চারণ যথেষ্ট নয় যদি অন্তরে নিয়ত না থাকে।
যদি মুখের কথা এবং অন্তরের নিয়ত ভিন্ন হয়, তাহলে বিবেচ্য হবে যা অন্তরে রয়েছে।
যেমন: কেউ যদি অন্তরে যুহরের নিয়ত করে অথচ মুখে বলে ‘আসর’, কিংবা অন্তরে হজের নিয়ত করে কিন্তু মুখে বলে ‘উমরা’ অথবা এর উল্টো — তাহলে গ্রহণযোগ্য হবে যা অন্তরে ছিল।
দারদীর বলেছেন: যদি কেউ ভুলবশত মুখে অন্য কিছু বলে ফেলে, তবে অন্তরের নিয়তই বিবেচ্য হবে। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে মুখে অন্য কিছু বললে, সে উপহাসকারী হিসেবে বিবেচিত হবে এবং তার সালাত বাতিল হয়ে যাবে।
২. সব ইবাদতের ক্ষেত্রে অন্তরের নিয়তের সঙ্গে মুখে উচ্চারণ শর্ত নয়।
এরপর ফকিহগণ নিয়তের উচ্চারণের শরঈ হুকুম নিয়ে মতভেদ করেছেন:
• হানাফি মাজহাবের নির্বাচিত মত, শাফেঈ এবং হাম্বলি মাজহাবের মূল মতে, ইবাদতের সময় নিয়তের উচ্চারণ সুন্নাত, যাতে জিহ্বা অন্তরের সঙ্গে মিল রাখে।
• কিছু হানাফি ও কিছু হাম্বলি আলিম বলেছেন যে, নিয়তের উচ্চারণ মাকরূহ (অপছন্দনীয়)।
• মালিকি মাজহাব বলেছে, ইবাদতে নিয়তের উচ্চারণ জায়েয,
তবে এটি বর্জন করাই উত্তম, তবে যার মধ্যে الوسوسة (শয়তানের পক্ষ থেকে সন্দেহ ও বিভ্রান্তি) রয়েছে, তার জন্য মুখে উচ্চারণ করা পছন্দনীয়, যাতে তার সন্দেহ দূর হয়ে যায়।
- আল-মাউসূআতুল ফিকহিয়্যাতুল কুয়াইতিয়্যাহ ৪২/৬৬-৬৭।
✍ ফতোয়াদাতা: Muhammad Ainul Huda · ০৫-১১-২০২৬ · মাযহাব: হানাফি
ইবনু তাইমিয়্যাহ নিয়তের উচ্চারণ সম্পর্কে বলেন:
"নিয়ত উচ্চারণ করা, তা জোরে বলা এবং তা বারবার করা — এটি নিষিদ্ধ।
যে ব্যক্তি এটি করে, সে অপরাধ করছে। আর যদি কেউ এটিকে দ্বীনের অংশ মনে করে, তাহলে সে মুসলমানদের সর্বসম্মত মত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।
তাকে এ বিষয়ে বুঝানো হবে; যদি সে তাতে অটল থাকে, তবে তাকে হত্যা করা হবে। - মুখতাসারুল ফাতাওয়া আল-মিসরিয়্যাহ, পৃঃ ১০
আমি বলি: এই ইজমা (সর্বসম্মত মত) কোথায়? অথচ রাসূলুল্লাহ ﷺ তো নিজেই হজের সময় নিয়ত উচ্চারণ করেছেন এবং তা জোরে বলেছেনঃ (হে আল্লাহ! আমি হজ ও উমরার নিয়তে হাজির)।
সুতরাং, সন্দেহ নেই যে, সত্য মতটি হলো — জুমহূরের (অধিকাংশ আলেমদের) পক্ষেই।
কাউকে তাকফীর ও হত্যার হুকুম দেয়া এত সহজ ব্যাপারে নয়। তাকফীরের ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন না করা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের নীতি নয়।